24/09/2022
নামাজের গুরুত্ব

নামাজের গুরুত্ব, ফজিলত ও শাস্তি সম্পর্কিত আলোচনা।

নামাজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবাদাত, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের ভিতর একটি স্তম্ভ হল নামাজ। নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কিত বিষয়ে কোরআন এবং হাদীসে অসংখ্য আলোচনা এসেছে।

পোস্টটি নামাজ ফরজ হওয়ার ইতিহাস, নামাজের গুরুত্ব, নামাজ যেভাবে হওয়া উচিত এ বিষয় দিয়ে সাজানো হয়েছে। নিম্নে নামাজের গুরুত্ব ফজিলত ও শাস্তি সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো।

নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে কোরআনের আয়াত :

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-

اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَ الصَّلٰوۃِ ؕ وَ اِنَّہَا لَکَبِیۡرَۃٌ اِلَّا عَلَی الۡخٰشِعِیۡنَ

তোমরা ধৈর্য্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করো * নিশ্চয়ই তা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের ওপর কঠিনতর।( সুরা বাকারা আয়াত – ৪৫ )

এই আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানলাম আমাদের ওপর আল্লাহ তাআলা নামাজ কে ফরজ করে দিয়েছেন। প্রিয় বন্ধুরা এখন আমরা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব প্রথমেই আমরা জানবো আমাদের উপর কিভাবে নামাজ ফরজ হলো।

নামাজ ফরজ হওয়ার ইতিহাস: 

  • নামাজ ফরজ হওয়ার ইতিহাস সম্পর্কে বুখারী শরীফে একটি লম্বা হাদীস রয়েছে, সেই হাদীসের মূল অংশটুকু তুলে ধরছি:

আনাস ইবনে মালিক (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আবূ যর (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি ( রাসুল সা.) বলেছেনঃ আমি মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে আমার ঘরের ছাদ উন্মুক্ত করা হ’ল। তারপর  জিবরীল (আঃ) এসে আমার বক্ষ বিদীর্ণ অর্থাৎ সিনা চাক করলেন। আর তা যমযমের পবিত্র পানি মাধ্যমে ধৌত করলেন। অতঃপর হিকমাত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি সোনার পাত্র আনলেন এবং তা আমার বুকের মধ্যে ঢেলে দিয়ে সেলাই বা বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর হাত ধরে আমাকে দুনিয়ার আসমানের দিকে নিয়ে রওয়ানা হলেন। এরপর যখন পৃথিবীর আকাশে আসলাম জিব্রীল (আ.) আকাশের রক্ষককে বললেনঃ দরজা খোল- আসমানীরক্ষক বললেনঃ আপনি কে??  জিবরীল (আ.) বললেনঃ আমি জিবরীল (আ.)। আকাসমানী রক্ষক বললেনঃ আপনার সাথে কি কেউ রয়েছেন? জিবরাঈল (আ.) বললেনঃ হ্যাঁ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে আছেন।

অতঃপর রক্ষী বললেনঃ তাকে কি আহ্বান করা হয়েছে? জিবরীল( আ.) বললেনঃ হ্যা !

অতঃপর যখন আমাদের জন্য পৃথিবীর আসমানকে খুলে দেয়া হল তখন আমরা জগতের আসমানে প্রবেশ করলাম- 

এরপরে আল্লাহর রাসূল (সা.)সেখানে অনেক আশ্চর্যজনক জিনিস দেখতে পান, এবং তার সাথে অনেক নবীর সাক্ষাৎ হয়। বিশেষ করে হযরত আদম আঃ, হযরত নূহ আঃ, হযরত ঈসা আঃ, হযরত মুসা আঃ 

এরপরে – নাবী (সা.) বলেন অতঃপর আমাকে আরো ঊর্ধ্বে উঠানো হল,তখন এমন এক সমান স্থানে এসে আমি উপস্থিত হই যেখানে লেখার শব্দ শুনতে পাই।

অতঃপর আল্লাহ আমার উম্মাতদের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করে দেন। অতঃপর তা নিয়ে আমি চলে আসি। সর্বশেষে যখন মূসা (আ.)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন তিনি বললেনঃ মহান আল্লাহ তা‘আলা আপনার উম্মাতদের জন্য কী ফরজ করেছেন? আমি বললামঃ ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন,

এর পর মুসা আঃ বললেনঃ আপনি আবার আল্লাহর নিকট ফিরে যান, কেননা আপনার উম্মাত তা পলন করতে পারবে না।

আমি ফিরে গেলাম। আল্লাহ পাক অল্প কিছু কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আ)-এর নিকট আবারও পৌছালাম আর বললামঃ কিছু অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আবারও আল্লাহ তাআলার নিকট ফিরে যান। কারণ আপনার উম্মাত এটিও আদায় করতে ব্যর্থ হবে। আমি ফিরে গেলাম। তখন আরো কিছু কমিয়ে দেয়া হলো। আবারও মূসা (‘আ)-এর নিকট পৌছালাম, এবারও তিনি বললেনঃ আপনি পুনরায় আপনার মহান রবের নিকট ফিরে যান- কারণ আপনার উম্মত এটিও আদায় করতে সক্ষম হবে না। তখন আমি পুনরায় গেলাম, তখন আল্লাহ পাক ঘোষণা দিলেন:  এই পাঁচ ওয়াক্ত “নেকির দিক দিয়ে” ৫০ ওয়াক্ত (বলে গণ্য হবে)। আমার কথার কোন পরিবর্তন হয় না।

( মূল হাদিসের সংক্ষিপ্ত অংশ )

(১৬৩৬, ৩৩৪২; মুসলিম ১/৭৪, হাঃ ১৬৩, আহমাদ ২১১৯৩) 

  •  প্রিয় বন্ধুরা এই হাদিসটি যদি একজন মমিন সুন্দর ভাবে বিশ্লেষণ করে তাহলে সে অনুধাবন করতে পারবে নামাজ আমাদের জন্য আল্লাহপাকের তরফ থেকে কত বড় নিয়ামত!
  • বন্ধুরা! এতক্ষণ তো নামাজ ফরজ হওয়ার ইতিহাস জানলাম, এখন আমরা জানবো এই নামাজের ফজিলত সম্বন্ধে।

নামাজের গুরুত্ব ফজিলত: এবং নামাজ পরিত্যাগের শাস্তি

আল্লাহ তা’আলা বলেন :

  • وَأۡمُرۡ أَهۡلَكَ بِٱلصَّلَوٰةِ وَٱصۡطَبِرۡ عَلَيۡهَاۖ لَا نَسۡ‍َٔلُكَ رِزۡقٗاۖ نَّحۡن• نَرۡزُقُكَۗ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلتَّقۡوَى{  [طه: ١٣٢ }

“ তোমারা তোমাদের আহালদের সালাতের আদেশ দাও, আর তাতে স্থির থাক, আমরা তোমার নিকট কোনো রুজি চাই না, আমরাই তোমাকে রুজী দেই এবং শুভ ফলাফল তো তাকওয়াধারীদের

জন্য।” [সূরা ত্বাহা, আয়াত: ১৩২

ইবন কাসীর (রহ.) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন:   যদি সালাত কায়েম কর এমনভাবে তোমার নিকট রুযী আসবে যার তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

চিন্তা করুন , আপনি মহান আল্লাহকে ভক্তি এবং শ্রদ্ধার সাথে সিজদা দিবেন, মহান মালিক আপনার জন্য রিজিকের জিম্মাদার হয়ে যাবেন। তাহলে আজ থেকে সারাদিন রিজিকের পিছনে না দৌড়ে, নামাজের পিছে দৌড়ান, রিজেক আপনার পিছে দৌড়াবে।

প্রিয় বন্ধুরা ” নামাজের গুরুত্ব ফজিলত সম্পর্কে হাদিস : হযরত আবু হোরায়রা( রা.) বলেন:   

আমি রাসূল ( সা.) কে বলতে শুনেছি আল্লাহর রাসূল সা. বলেন “أَرَأَيْتُمْ لَوْ أَنَّ نَهَرًا بِبَابِ أَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ فِيهِ كُلَّ يَو خَمْسًا  বলতো যদি তোমাদের কারো বাড়ির সামনে  একটি নদী থাকে আর সে যদি তাতে প্রতিদিন পাঁচবার করে গোসল করে –

.مَا تَقُولُ ذَلِكَ يُبْقِي مِنْ دَرَنِهِ

_ তাহলে কি তার গায়ে কোন ময়লা থাকবে? 

সাহাবায়ে কেরাম উত্তর দিল –

ইয়া রাসুল আল্লাহ ! তার গায়ে কোন ময়লা অবশিষ্ট থাকবে না।

তখন রাসূল ( স.) বললেন : قَالَ فَذَلِكَ مِثْلُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ يَمْحُو اللهُ بِهِ الْخَطَايَا 

অর্থ: এই হলো সালাতের উদাহরণ! পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার গুনাহ সমূহ মুছে দেন।

অর্থাৎ প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করলে মানুষ যেভাবে পরিচ্ছন্ন থাকে ঠিক সেভাবে প্রতিদিন একজন মুমিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ঠিকমত পালন করলে তারও আত্মা পরিষ্কার এবং পরিচ্ছন্ন থাকে।

হাজিরিন ! সালাত সম্পর্কে বহু ফযিলতের কথা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, যা বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না, তবে নামাজের ফজিলত এর আরো একটি হাদিস বলে শেষ করবো – 

(হাদিস নম্বর-১২ তারবানীশরীফ)

 হজরত আনাস বিন মালিক থেকে বলেন 

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন : 

من صَلَّى الصَّلَاةَ لِوَقْتِهَا،

অর্থ: যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সঠিক সময়ে সম্পন্ন করে এবং 

وَأَسبَغَ لَهَا وُضُوْءَهَا، وَأَتَمَّ لَهَا قِيَامَهَا وَخُشُوْعَهَا وَرُكُوْعَهَا وَسُجُوْدَهَا خَرَجَتْ وَهِيَ بَيْضَاءُ مُسْفِرَةٌ

অর্থ: উহার অজু, কিয়াম, খূশূখুজু, রুকূ ও সিজদা পুরো সঠিক ভাবে আদায় করে ঐ সব নামাজ  উজ্জ্বল আলোকরশ্মি হয়ে- বলে 

 تَقُوْلُ: حَفِظَكَ اللّٰهُ كَمَا حَفِظْتَنِيْ

অর্থ: আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করুন, যেমনি তুমি আমাকে রক্ষা করেছ। 

আর যে ব্যক্তি যথাসময়ে নামাজ না পড়ে অন্য সময়ে পড়ে এবং ওজু, কিয়াম খূশূ, রুকূ ও সিজদা পরিপূর্ণভাবে করে না, ওই নামাজ অন্ধকার হয়ে এ বলে বের হয় যায়, 

ضَيَّعَكَ اللّٰهِ كَمَا ضَيَّعْتَنِيْ، حَتَّى إِذَا كَانَتْ حَيْثُ شَاءَ اللّٰهُ لُفَّتْ كَمَا يُلَفُّ الثَّوْبُ الْخَلَقُ، ثُمَّ ضُرِبَ بِهَا وَجْهُهُ-

অর্থ: তোমাকে আল্লাহ ধ্বংসপ্রাপ্ত করুক, যেভাবে তুমি আমাকে নষ্ট করেছ। শেষ পর্যন্ত ওই জায়গায় নিয়ে পৌঁছে যেখান পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করেন, সেখান থেকে পুরানো নর্দমার মতো একসাথে করে তার মুখে নিক্ষেপ করা হয়। (তাবরানী ১২) 

এগুলোতো গেল দুনিয়ার ফজিলত এখন একটি হাদিস বলবো আখিরাতে নামাজী ব্যক্তির ফজিলত এবং পরিত্যাগকারীর শাস্তির ব্যাপারে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে বক্তি যথাযথভাবে নামাজ সম্পন্ন করবে, কিয়ামাত দিবসে নামাজ তার জন্য নূর হবে; হিসেবের সময়কালে দলিল হবে এবং নাজাতের ওসিলা হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সঠিক ভাবে নামাজ আদায় করবে না, নামাজ তার জন্য নূর, দলিল এবং নাজাতের ওসিলা হবে না। বরং তার হাশর হবে কারূন, ফিরাউন, হামান এবং উবাই ইবনে খালফের সংস্পর্শে । (মুসনাদে আহমাদ, বাইহাকি, মিশকাত)

প্রিয় বন্ধুরা এতক্ষণ আমরা কোরআন এবং হাদিস থেকে নামাজ সম্পর্কিত ফযিলত এবং স্বল্প পরিসরে শাস্তির সংক্ষিপ্ত কিছু কথা শুনেছি।

এখন আমরা জানবো আমাদের নামাজ কেমন হওয়া দরকার- 

নামাজ যেভাবে হওয়া উচিত : নামাজের খুশু খুজু 

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন –

اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ-

”নিশ্চয়ই নামাজ পাপকার্য অশ্লীলতা থেকে মানুষকে বিরত রাখে”।  (সূরা: আনকাবূত

আয়াত-৪৫)

প্রিয় বন্ধুরা এখানে ভালোভাবে লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তাআলা তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, নামাজ মানুষকে পাপ কাজ ও অশ্লীলতা থেকে মুক্তি দেবে, এখন একটু সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন, মানুষ নামাজ পড়ে কিন্তু সুদ খায়, মানুষ ঠিকমতো মসজিদে যায় কিন্তু পর্দা করে না, পাড়ার বড় মুসল্লী অথচ খাদ্যে ভেজাল দেয়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকমতো পড়ে কিন্তু অন্যের জমি দখল করে নেয়। এখন আল্লাহ তো বলেছেন নামাজ মানুষকে পাপ কাজ থেকে মুক্তি দিবে- তাহলে এরা নামাযও পড়তেছে অথচ পাপ করতেছে তাহলে কি আল্লাহর কথা মিথ্যা? (নাউজুবিল্লাহ)  আল্লাহর কথা কখনো মিথ্যা হতে পারেনা, আসলে এখানে মূল ব্যাপারটা হল আল্লাহ পাক যেভাবে আমাদেরকে নামাজে নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক সেইভাবে আমরা নামাজ আদায় করতে পারিনা, আমাদের নামাজে অনেক ত্রুটি, আমাদের খুশু-খুযু ঠিক থাকেনা, পরিপূর্ণ একটি হৃদয় নিয়ে আমরা আল্লাহকে সিজদা দিতে পারিনা এইজন্য নামাজের যে নিয়ামত তা থেকে আমরা বঞ্চিত হই। আমাদের নামাজ কেবল আদায় হয় কিন্তু কবুল হয় না, এখন আমাদের এমন একটি হৃদয় বানানো দরকার যে হৃদয়টি নামাজের সময় নামাজের ভিতরেই স্থির থাকবে। আর এমন হৃদয় কে বলে “হুজুরী কলব”

আল্লাহর রাসূল ( সা.) বলেন – 

لا صلاه الا بحضور القلب_

” হুজুরি কলব ছাড়া নামাজ হয় না” 

যখন একজন মানুষের হুজুরি কলব‌ বা পরিচ্ছন্ন হৃদয় হবে তখন নামাজে দাঁড়ালে তার হৃদয়টা স্থির থাকবে ছোটাছুটি করবেনা। নামাজের ভিতরে পরম শান্তি অনুভব করবে, পক্ষান্তরে যার হৃদয় পরিচ্ছন্ন নয় তার হৃদয়টা নামাজে দাঁড়ালে ছোটাছুটি করবে ,অস্থির অনুভব হবে এমন নামাজ পড়ে জীবনে ফায়দা পাওয়া সম্ভব না।

এখন তাহলে হুজুরি কলব কাকে বলে সেটা নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটু আলোচনা করবো‌।

আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন : 

ان تعبد الله كانك تراه فان لم تكن تراه فانه يراك 

অর্থ:” যখন তুমি এবাদতে দাঁড়িয়ে যাবে তখন মনে করবে আল্লাহ কে তুমি দেখতেছো –  যদি এটা না মনে করতে পারো তাহলে অন্তত এটা মনে করো যে আল্লাহ তোমাকে দেখতেছেন ” 

প্রিয় বন্ধুরা, হাদীসটি ভালোভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করুন, আপনি যখন নামাজে দাঁড়িয়ে যাবেন তখন আপনি হৃদয়ে এটা মনে করবেন বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ আপনাকে দেখতেছেন। আমরা পরিচ্ছন্ন অন্তর নিয়ে এবাদত করার ব্যাপারে আরো আলোচনা করবো তবে তার আগে আমরা সাহাবায়ে কেরাম কিভাবে নামাজ পড়েছিলেন তাদের নামাজ কতটা খুশু-খুযু ছিল, সেই ব্যাপারে দু-একটি ঘটনা জেনে নেই। 

প্রথম ঘটনা – 

রাসুলে পাকের সাহাবীগণ (রা) অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন  হৃদয় খুশু-খুজুর সাথে নামায আদায় করতেন। শত্রুর বিক্ষিপ্ত তীরও তাদের নামাযে মনোযোগের ব্যাপারে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারত না। এ সম্পর্কে হজরত জাবের (রা.) একটি ঘটনা বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে জাতুর-রিকা যুদ্ধের অভিযানে বেরিয়ে পড়লাম । তখন এক ব্যক্তি মুশরিকদের এক লোকের সাথী কে  হত্যা করে। ফলে ঐ মুশরিক এ বলে শপথ করে যে, যতক্ষণ না পর্যন্ত মুহাম্মাদ (সা.) এর কোন সাহাবির রক্ত বমি না করব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি শান্ত হব না। অতএব সে রাসূল (সা.) এর খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন… 

নবী (সা.) এক জায়গায় উপস্থিত হয় বললেন, এমন কে আছো, যে আমাদের পাহারা বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে? তখন মুহাজিরদের মধ্য থেকে একজন এবং আনসারদের মধ্য থেকে একজন রাজি হয়ে গেলেন। তিনি রাসুল সা. বললেন, তোমরা দু’জনে গিরিপথের চূড়ায় অবস্থান করবে। এর পরে দুইজনে গিরিপথে আসলো, মুহাজির লোকটি ঘুমিয়ে পরল। আর আনসারী লোকটি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ে মশগুল হন। এমন সময় সেই মুশরিক ব্যক্তি হাজির হয়ে আনসারী লোকটিকে নামাজ রত অবস্থায় দেখেই চিনে ফেলল। সে বুঝতে সক্ষম হলো তিনি (রাসুল (সা.) এর নিরাপত্তা প্রহরী। অতএব সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাঁর প্রতি একটি তীর ছুঁড়ে মারল, যা তার দেহে বিঁধে গেল ! (অথচ তিনি কোনো কষ্ট অনুভব করলেন না নামাজ ছেড়ে দিলেন না) সাহাবি তা বের করে নিলেন। এরপরে সেই মসজিদ লোকটি প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে একে একে তিনটি তীর নিক্ষেপ করল। কিন্তু আনসারী সাহাবী  রুকু সিজদা করে (যথারীতি সালাত শেষ করে) মুহাজির সাহাবী কে জাগালেন। সাহাবীগণ সবাই সতর্ক হয়ে গিয়েছেন, এটা বুঝতে পেয়ে মুশরিক লোকটি পালন করল। মুহাজির সাহাবী আনসার সাহাবী ভাইকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ! প্রথম তীরটি নিক্ষেপের পরপরই আমাকে তো সতর্ক পড়তে পারতেন কিন্তু সেটা করলেন না কেন? আহত সাহাবী তিনি বললেন, আমি (সালাতে) এমন একটি সুরা তিলাওয়াত করতেছিলাম যা ছাড়তে আমি পছন্দ করিনি। (সুনানে আবু দাউদঃ ১৯৮)‌‌ ।

সুবহানাল্লাহ ! প্রিয় বন্ধুরা চিন্তা করে দেখুন আনসার সাহাবীর ঈমানটা কত মজবুত, তার ওই জায়গাটায় আমাদের মত মানুষের কথা ভেবে দেখুন, আমরা স্থির থাকতে পারতাম কিনা। জীবনের কথা চিন্তা না করে যথারীতি নামাজ চালিয়ে গেছে, এতটাই নামাজের ভিতরে বিভোর ছিল।

সাহাবায়ে কেরামদের জীবনী আলোচনা করলে দেখা যায় তারা নামাজকে ধন-সম্পদ এবং জীবনের চাইতেও মূল্যবান মনে করত। 

এই সম্পর্কিত আরেকটি ঘটনা বলব 

দ্বিতীয় ঘটনা : 

হজরত তালহা (রা.) একজন প্রশিদ্ধ সাহাবী ছিলেন। সালাতের প্রতি মনোযোগে বিঘ্নিত হওয়ায় তিনি তার প্রিয় এবং অনেক বড় বাগান আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন। এ সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা) বর্ণনা করেন, হজরত আবু তালহা আনসারী (রা.) একদিন তাঁর এক বাগানে সালাত আদায় করতেছিলেন। এর ভিতরে একটি ছোট পাখি ওড়াউড়ি শুরু করল, (বাগান এত ঘন এবং সংকীর্ণ ছিল যে এই ক্ষুদ্র পাখিটি বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না), তাই পাখিটি এদিক-সেদিক প্রস্থান করার পথ খুঁজতে শুরু করল। এই দৃশ্য হযরত তালহা রা. এর খুব ভাল লাগল। ফলে তিনি কিছুক্ষণ সেদিকে অবলোকন নয়নে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তার মনে পড়ে গেল তিনি নামাজ রত অবস্থায় আছেন অতঃপর নামাযের দিকে মনোযোগ দিলেন। কিন্তু (অবস্থা এমন দাঁড়াল) তিনি (তখন) মনেই করতে পারছিলেন না যে, নামায কত রাকআত আদায় করেছেন। তিনি বললেন, এই মাল ( বাগান) আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছে, এবং নামাযের ব্যাপারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) এর খেদমতে হাজির হলেন এবং বাগানে তাঁর সম্মুখে যে পরীক্ষা উপস্থিত হয়েছিল তা বর্ণনা করলেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই বাগান আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করছি। কেননা এই বাগান নামাজের ব্যাপারে আমাকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে এখন আপনি যেখানে পছন্দ করেন উহা সেখানে ব্যয় করুন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ২১৪)

প্রিয় বন্ধুরা ! চিন্তা করুন , নামাজের সময় আমাদের মনোযোগ এদিক সেদিক চলে যায় ,কিন্তু সেই ব্যাপারে কখনো তা আমরা অনুতাপ হই না, আদর্শ রাসূলুল্লাহ (স.)এর সাহাবা সম্পূর্ণ বাগানটাই আল্লাহর ওয়াস্তে বিলীন করে দিলেন।

সেজন্য আমাদের মনকে নামাজের ভিতরে স্থির রাখতে হবে, নতুবা কখনোই আমরা নামাজের পূর্ণাঙ্গ স্বাধ এবং নেয়ামত অনুধাবন করতে পারবোনা। প্রথম প্রথম আমাদের অনেক কষ্ট হবে, নামাজের সময় মন এদিক সেদিক ছুটে যাবে, আমাদের বিচ্ছিন্ন মন যখন এদিক সেদিক ছোটাছুটি করবে, তখন সেই মন কে বারবার নামাজের ভিতরে স্থির রাখতে হবে। এবং আল্লাহ পাকের সাহায্য চাইতে হবে, দেখবেন ধীরে ধীরে আল্লাহ আপনার দিলকে নামাজ মুখী বানিয়ে দিয়েছে এবং আপনার হুজুরি কলবে তৈরি হয়েছে। ‌ এ ব্যাপারে একটি যুক্তির কথা বলি-

যুক্তির কথা: 

ধরুন আপনি একটি মাঠে, আপনার গরু বেঁধে আসলেন। গরুটি বেঁধে আপনি গাছের তলায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন দেখলেন আপনার গরুটি ছুটে গিয়ে অপর একজন কৃষকের ফসল খাচ্ছে! তখন আপনি দৌড়ে গিয়ে, আপনার গরুটিকে ফসলের ক্ষেত থেকে টেনে আনার জন্য দড়ি ধরে টানাটানি করতেছেন, ঠিক তখনই দেখলেন সেই ক্ষেতের কৃষক, আপনাকে গালিগালাজ না করে বরং আপনার সাথেই গরুটি টেনে আনার ব্যাপারে হেল্প করতেছে! এতে করে আপনি সহজেই গরুটি কৃষকের ক্ষেত থেকে নিয়ে আসতে পারলেন। 

যুক্তির কথা হল, গরুটি হলো বিচ্ছিন্ন মন যা নির্দৃষ্ট

ঘাসের পরিবর্তে ফসলের ক্ষেতে ঢুকে পড়ছিল, ক্ষেত থেকে গরুটিকে আনার জন্য আপনি যে বরং বার চেষ্টা করেছিলেন তা ক্ষেতের মালিক লক্ষ্য করলো, ক্ষেতের মালিক যখন দেখল আপনার কোন দোষ নেই বরং আপনি উনার ফসল রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করতেছেন তখন ক্ষেতের মালিক স্বয়ং নিজেও আপনাকে হেল্প করলো। ঠিক তেমনি ভাবে নামাজের মধ্যে আমাদের বিচ্ছিন্ন মন যখন এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করবে, তখন আপনি বারবার সেই মনকে নামাজের ভিতরে স্থির রাখতে চেষ্টা করবেন, যখন বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ দেখবে আমার দুর্বল বান্দা নামাজের ভিতর মনকে ধরে রাখতে চেষ্টা করতেছেন, তখন আল্লাহ আপনাকে কুদরতি সাহায্য দান করবেন। যার ফলে আপনার প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর সাহায্য দুই মিলিয়ে নামাজের ভিতরে খুশু খুজু তৈরি হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি চেষ্টা না করেন তাহলে সাহায্য আসবে কোত্থেকে? 

প্রিয় বন্ধুরা আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করবো, আল্লাহ আমাদের সকলকে সুন্দর নামাজি জিন্দেগি দান করুক, এবং খুশু-খুযুর সাথে নামাজ পড়ার তৌফিক দান করুক।

 

নামাজের গুরুত্ব, ফজিলত ও শাস্তি সম্পর্কিত আলোচনা।

Share

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.